লেখক-শিহাব রিফাত আলম
পৃথিবীতে শব্দেরও মন আছে। কিছু শব্দ দম্ভ করে বাজে, কিছু শব্দ নীরবে কাঁদে। আর কিছু শব্দ এমন, যেগুলো শুধু শ্রবণ নয়—মনের ভেতর কোথাও এক অদ্ভুত সুর তোলে, স্মৃতির জানালায় ধাক্কা দেয়। “চুড়ি” সেইরকম এক শব্দ। এর ঝংকারে প্রেম আছে, অভিমান আছে, আবার কখনো বা বিনা কারণে বুকের ভেতর একরাশ হাহাকার জাগে।
কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই শব্দটার সঙ্গে বাঙালি কল্পনাশক্তির কতটা গভীর যোগ আছে? নদীর ঘাটে কিশোরী বধূর মুচকি হাসি, পূজোর রাতে প্রেমিকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা যুবক, কিংবা মায়ের আঁচলে লুকানো ছোট্ট বোনটার খুশির টুকরো—সবখানেই যেন চুড়ির এক অলিখিত উপস্থিতি।
এই গল্পটা সেই চুড়ির। তবে দোকানে সাজানো দামি চুড়ির নয়—এই গল্প এক ফেরিওয়ালার, যার জীবন জুড়ে শুধুই রিনিঝিনি… আর অল্প কিছু স্বপ্ন।
চুরির রিনিঝিনি শব্দে কার না ধ্যান ভাঙ্গে? কি জানি বাপু, আমি এত সাধু সন্ন্যাসী নই। চুরির শব্দ আমার ভীষণ প্রিয়। পৃথিবীর যে কয়টি মিষ্টি শব্দ আছে তারমধ্যে চুড়ির শব্দ আমার ভালো লাগার একটি। তাই আমি ছোটবেলা থেকেই চিন্তা করতাম বড় হয়ে চুড়িওয়ালা হব।
“এনে দে রেশমি চুড়ি নইলে যাব বাপের বাড়ি ” এই গানটা ভীষণ ভাবেই ইফেক্ট করেছিল আমাকে আর আমার
জীবনকে।
আমি একজন ফেরিওয়ালা। প্রত্যেকদিন মাথায় একটা ঝাকা নিয়ে, প্রখর রোদে পিচঢালা পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে চুড়ি ফেরি করি। চার পাঁচবার গলা খাকারি দিয়ে ডাক তুলি।
চুড়ি লাগবো গো চুড়ি?
বাড়ির বউ আপা গো চুড়ি লাগবো চুড়ি?
লাল চুড়ি, নীল চুড়ি, সবুজ চুড়ি, হলুদ চুড়ি। কার কোন রঙের চুড়ি লাগব?!
সাহেবরা কি বউদের জন্য চুড়ি কেনে না?
মায়েরা কি মেয়েদের জন্য চুড়ি কেনে না?
ভাইজানরা বোনদের চুড়ি কিনে দেয় না?
সারাটা দিন কষ্ট করি। একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এক বিল্ডি এর বারান্দা থেকে ডাক দিল একজন তরুণী।
-এই চুড়িওয়ালা, চুড়িওয়ালা।
আমি উপরে তাকালাম, গুনে দেখলাম সাত তলা থেকে ডাকছে।
আমি উপরে তাকিয়ে তাকে উদ্যেশ্য করে বললাম,
-চুড়ি লাগবো গো আপা, চুড়ি?
আমাকে তিনি উপরে আসতে বললেন।
মনে মনে ভাবলাম হয়তো লিফট আছে সমস্যা কি? গিয়ে চুড়িটা বেইচা আসি। চুড়ি হয় তো গোছা ধরেই নিবে।
আল্লাহ সহায়।
বিল্ডিংয়ে ঢুকে দেখি লিফট নাই। মাথায় ঝাঁকা নিয়ে সাত তলায় ওঠার কথা ভাবতেই ঘামতে শুরু করলাম। শেষ পর্যন্ত কষ্ট মষ্ট করে সাত তলায় উঠলাম।
দেখি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। গায়ের রং শ্যামলা। শ্যামলার ভেতর ভালোই লাগলো দেখে।
আমি একজন চুড়িওয়ালা। আমি ওই দুঃস্বপ্ন দেখিনা। কিন্তু কেন জানি আমার ভালো লাগলো, মূলত শ্যামলার মধ্যে একটা মায়াবতী মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমার সামনে। যদিও সেই সাহস করা উচিত না আমার। কখনো মনে মনে সেই বেয়াদবি করি নাই কারণ আমি গরিব মানুষ কল্পনা করাও পাপ। আল্লাহ নারাজ হলে হয়তো চুড়ি বিক্রি আমার হবে না।
স্বপ্ন দেখা ভালো তবে নিজের অবস্থানের মধ্যে থেকেই।
সে আমার চুড়ি গুলো দেখতেই থাকলো, অনেকক্ষণ দেখলো। দেখার পর বলল,
-এই নীল রঙের চুড়িটা আমার খুব ভালো লাগছে। দাম কত?
-এক বান্ডিল ৭০ টাকা। দুটো ১৪০ টাকা।
-আপনার কষ্ট করে আর একদিন আসতে হবে। আমি সেদিন দুইগোছা চুড়ি নিব।
আরেকদিন আসতে হবে, আর আজ সে নেবে না? এই কথাটা আমার মাথায় ঢোকা মাত্র উপরে উঠতে গিয়ে যে পরিমাণ ঘেমে ছিলাম তার চেয়ে তিনগুণ বেশি ঘামাতে শুরু করলাম। চিন্তায় পড়ে গেলাম এই বয়সে স্ট্রোক করলাম কিনা ৩০ কেজি ওজনের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে সাত তলা উঠার পর যদি কেউ বলে আজ নয় আরেকদিন। ছেলে মানুষ বলে ঝরঝর করে কাঁদতে পারলাম না। কাস্টমার লক্ষী নিতেও পারে নাও নিতে পারে তাই বলে সাত তলায় টেনে নিয়ে এ কথা?
-কেন?
-আজকে তো আমার কাছে টাকা নেই। আপনি এত সুন্দর করে যেভাবে ডাক দেন, “চুড়ি লাগবো গো চুড়ি?” প্রতিদিন শুনি। তাই মনে মনে ঠিক করেছিলাম, একদিন আপনার কাছ থেকে অনেক চুড়ি কিনবো।
বিনিময় আপনি আমার সামনে সুন্দর করে বলবেন, চুড়ি নিবেন গো চুড়ি?
আপনি এত সুন্দর করে ডাক দেন কি করে?
ভীষণ সুরেলা কন্ঠ।উত্তর দেয়ার মত আমার কন্ঠে আর শক্তি ছিল না।
আমার শরীর দিয়ে তর তর করে ঘাম পড়তে থাকলো। সাত তলায় উঠতে না আমার যত কষ্ট হয়েছিল এখন তার চেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে। রাগে আমার শরীর থেকে ঘাম বের হচ্ছে।
কাস্টমারকে তো আর কিছু বলা যায় না। কিন্তু আমার মনে মনে বলতে ইচ্ছা করছিল পকেটে পয়সা নাই তাহলে আমাকে ডেকেছো কেন? তুমি বললেও কম হয়ে যাবে, ডাকলি কেন তুই?সাত তলায় ওঠার কষ্ট বুঝিস? মাথার উপরে ৩০ কেজির একটা ঝাঁকা। এই কষ্ট তোরা বড়লোকের মেয়েরা বুঝবি কিভাবে?কিন্তু কিছুই বললাম না। ঝাঁকাটা মাথায় নিয়ে ৭ তলা থেকে নেমে ঠিক করলাম আজ আর চুড়ি বেচবো না। দিনটা ভীষণ খারাপ। মেয়েটার মায়াবী চেহারা আর মায়াবী মনে হচ্ছিল না। আমার কাছে মনে হল আজ যেখানেই যাব সেখানেই ধোকা খাব।
কারণ কোন এক অদৃশ্য কালো বিড়াল আমার পথ কেটে দিয়েছে।
একদিন চুড়ি না বেচলে সমস্যা হবে। অর্থনৈতিকভাবে মহাজনকে উত্তর দিতে হবে। তারপরও বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলাম।
বাড়িতে ঢোকা মাত্র মা আমার চেহারা দেখে বুঝে ফেলল কিছু একটা হয়েছে। মা জানতে চাইলো, কি হয়েছে বাছা? আমি শুধু বললাম, কালা বিলাই রাস্তায় আমার পথ কেটে দিছে তাই আজ আর চুড়ি বেচতে মন চাইলো না।
ওই এলাকায় অনেকদিন যাওয়া হয় না, ভুলে গিয়েছি এই ঘটনাটা। আমি ভেবেছিলাম আমার সাথে মশকরা করেছে। হয়তো ইচ্ছে করে আমাকে কষ্ট দিয়েছে। অনেকদিন পরে ওই দিকে দিয়ে আবার গেলাম। মনে মনে বললাম, আবার যদি আমার সাথে মশকরা করে ডাক দেয়, না শোনার ভান করে সোজা হেঁটে যাব।
-হাঁক দিতেই আবার উপর থেকে ডাক আসলো। উপরে তাকিয়ে দেখি ওই বাড়ি, ওই মেয়ে, ওই সাত তলা থেকে ডাকছে।
আমার তো দেখেই হাত পা কাঁপা শুরু হয়ে গেল। মনে হলো কাস্টমারকে মানা করা যাবে না। কিন্তু গেলেই আবার খালি হাতে ফিরে আসতে হবে। সময় নষ্ট! শক্তি নষ্ট।সেই সাথে মাথাও নষ্ট।
-আসতেছি গো আপা।
বলে হালকা করে তার বাড়ির ভিতরে ঢুকছি এমন একটা ভান করলাম। তারপরে আস্তে করে আমি অন্য দিকে চলে গেলাম।
আমাকে নিয়ে আবার মশকরা করবে? আমি গরিব হতে পারি। আমি একজন অসহায় মানুষ হতে পারি। কিন্তু আমার এই চুড়ি বেচেই জীবন ধারণ করতে হয়। মা বোনদের খরচ দিতে হয়। বাসা ভাড়া দিতে হয়। রাতের বেলা পড়ালেখা করে কলেজে ক্লাস করতে হয়। গ্রামের ছেলে আমি। তাই বলে আমার কষ্টের কি কোনো দাম নেই নাকি?
ওই এলাকাটাতে চুড়ি বেশি ভালো বিক্রি হয়। কিন্তু আমি ওই এলাকায় অনেক দিন যাই না ওই কালো বিড়াল মায়াবতীর ভয়ে। ওই এলাকায় অন্যদের থেকে আমার চুড়ি একটু বেশি বিক্রি হতো।
আমার হাঁক অনেকেই পছন্দ করতো।
এটা প্র্যাকটিসের খেলা মন থেকে যদি কেউ প্র্যাকটিস করে সেটা অসাধারণ হতে বাধ্য আর মানুষের দৃষ্টিতে মুগ্ধতা ছাড়াতেও বাধ্য।
এটা আমার মায়ের কথা আর আমি তাই করতাম সব সময়।
কন্ঠে বহুরকম ডাক তুলতাম কাগজে লিখে লিখে মুখস্ত করে নিয়েছি সব। একেকবার একেক রকম ডাক তুলতাম
মা বোনদের জন্য চুড়ি,
ভাবি চাচির জন্য চুড়ি, রেশমি চুড়ি,লাল চুড়ি, নীল চুড়ি, সবুজ চুড়ি, টিয়া চুড়ি,
আমার চুড়ি অনেক বিক্রি হওয়া শুরু হলো। আস্তে আস্তে আমার ইনকাম প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ হয়ে গেল। ৫০০ থেকে ৮০০। ৮০০ থেকে ১০০০। আমি একটু সচ্ছলতার দিকে আসলাম। কিছু টাকাও জমিয়ে ফেললাম ছোট বোনটার বিয়ে দিব ভেবে।
বাসার কিছু ফার্নিচার বদলালাম। ছোট বোনটাকে আমার মত চুড়িওয়ালার কাছে বিয়ে দেবো না। বিয়ে দিব অন্তত শিক্ষিত একটা ছেলের সাথে।
আবার কিছুদিন পর একদিন ভুলে-ভালে ওই এলাকায় ঢুকে পড়লাম। কারণ এক এলাকায় বেশি দিন বেচা বিক্রি ভালো হয় না।
ওই বিল্ডিং এর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। আবারও ওই সাত তলা থেকে ডাক আসলো। বলল,
-দাঁড়ান চুড়িওয়ালা ভাই দাঁড়ান! আপনার উপরে আসা লাগবে না আমি নিচে আসছি।
মেয়েটি চেঁচিয়ে আমাকে দাঁড়াতে বলল। আমি বললাম,
-না গো আপা আপনার নিচে নামতে হবে না। আমি আসুম উপরে।
-না আপনি এখানেই থাকেন আমি আসছি।
দারোয়ানকে বলল আমাকে দেখত, আমি যাতে দৌড়ে না পালিয়ে যাই
। এবং সে বলল “আমি নিচে আসছি। কিন্তু আমি বললাম,
-আমি আসবো আপনার আসা লাগবে না।
শেষের আমার কথায় থামলো। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ৩০ কেজির ঝাঁকা মাথায় নিয়ে উপরে উঠলাম।
আমাকে দেখেই বলল,
আপনি সেদিন পালিয়ে গেলেন কেন আমাকে ফাঁকি দিয়ে?
-কই আমি তো আপনাকে ফাঁকি দিয়ে পালাইনি।
-সেদিন যে আপনি বিল্ডিংয়ে ঢুকলেন আমি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থেকে দেখি আপনি আসেন না।
-ও ওই দিনের কথা! আপনি বলছেন আমাকে উপরে আসতে। কিন্তু আসলে আমার বাসা থেকে ফোন এসেছিল,
আপনার বউ ফোন করেছিল তাই এত তাড়াহুড়া করে চলে গেলেন?
না আপা আমি এখনো বিয়ে করিনি। ছোট বোনটারে বিয়া দিমু ভাবতেছি। ছোট ভাইটার পড়ালেখা শেষ করামু। নিজেও বিয়ে পাশ করুম তারপর বিয়া নিয়া ভাবমু।
বাহ সুন্দর ভবিষ্যতের রচনা বললেন আমাকে।
আমি তৎক্ষণাৎ বাসায় যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। ক্ষমা করে দিয়েন।
আমি আপনাকে যে দুটো চুড়ির বান্ডেল রাখতে বলেছিলাম সে দুটো চুড়ির বান্ডেল কি রেখেছেন?
আপা সাত তলায় ওঠার পরে যদি কেউ চুড়ি না নেয় এক দেড়শ টাকার। তাহলে আপনি বোঝেন কষ্টটা কত? ওই চুড়ি দুটো আমি রাখিনি। আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার থেকে কোনদিন চুড়ি কিনবেন না।
গরিব বলে মশকরা করেছেন
এরপরে যেদিন আপনি আবার ডেকেছিলেন তখন আমার মনে হয়েছিল আপনি আমাকে আবার এই কষ্টটা দেবেন। এই কষ্টটা আমি আসলে সেদিন আর করতে চাইনি তাই আমি পালিয়ে গিয়েছি।
ঐদিন সত্যিই আসলে আমার বাবা মা কেউ বাসায় ছিল না। আমি আপনাকে ডেকে ফেলেছিলাম এটা ঠিক। কারন আমি সব সময় আপনার এই আওয়াজটা শুনতাম। আমার কানে বাজতে থাকতো। কেন যেন এই শব্দগুলো আমার কানে ধাক্কা দিত। একটা মানুষ এত কষ্ট করে করে মেয়েদের জন্য চুড়ি বিক্রি করে এটা ভাবতে থাকতাম।
-আজ আপনাকে আমি হতাশ করব না। আপনার ঝাঁকাতে কয় গোছা চুড়ি আছে? কয়টা মেয়ে পড়তে পারবে?
-২০০ বান্ডিল চুড়ি আছে। মানে ২০০ জন মেয়ে পড়তে পারবে।
আমাকে জিজ্ঞেস করল
-আমার সাইজের চুরি আছে?
আমার অভিজ্ঞ চোখ দিয়ে তার হাত দেখেই বুঝতে পারলাম তার সাইজটা হচ্ছে মিডিয়াম।
আমি বললাম,
-হ্যাঁ আছে।
না আপনি আমার হাতটা ধরে দেখেন একটা সমস্যা আছে।
আমি তার হাতটা ধরে হাতে একটা চুরি পরিয়ে দিলাম।
-আমার আসলে সেদিন অনেক মন খারাপ হয়েছে আপনার জন্য। সারারাত ধরে মাথায় একটা বোঝা নিয়ে উঠার কষ্ট আমি অনুভব করেছিলাম। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যেদিন আপনার সাথে দেখা হবে, আপনার ঝাঁকায় যতগুলো চুরি আছে সব আমি কিনে নিব।
কোন দামাদামি করবো না। বলবো না যে সব কিনেছি তাই আমাকে কমে দেন। আপনি যে দামে চুরি বিক্রি করেন সেই দামেই আমি কিনব।
আমার মুখটা হাসি হাসি হয়ে গেল কিন্তু কোথাও একটা ভয়ার্ত চিহ্ন ভেসে থাকলো টাকাটা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত।
-কন কি আপা আমরা তো ফেরিওয়ালা। এসিতে বসে আপনি আমার সব কষ্ট অনুভব কইরা ফেললেন?
-হ্যাঁ করে ফেললাম। ভেতরে আসেন। বসেন।
আমি বাসার ভেতরে ঢুকলাম। সুন্দর একটা ড্রয়িং রুম। আমাকে সোফায় বসালো। আর বলল,
-আপনার কাছে মিডিয়াম সাইজের কয় গোছা চুড়ি আছে? যে কয় গোছা আছে সব গুলো আমাকে দিন। আমি আমার সব বান্ধবীকে চুড়ি গুলো গিফট করব।
বলবো চুড়ি লাগবো বান্ধবী চুড়ি? আমার কাছে লাল চুড়ি আছে নীল চুড়ি আছে, রেশমি চুড়ি আছে চুড়ি লাগবো বান্ধবীরা চুড়ি?
টাকা লাগবো না শুধু চুড়ি নিবে গো চুড়ি? লাগবো গো চুড়ি?
টোটাল কত হয় তাহলে?
-মিডিয়াম সাইজের ১৫০ বান্ডিল চুড়ি আছে। তাহলে আপনার আসে ১০৫০০ টাকার মতো। আপা এত টাকা লাগবে না ১০ হাজার টাকা দিলেই হবে।
-না। আপনি যেই দামে বিক্রি করেন সেই দামেই আমি কিনব। আমি খুব বেশি কিনেছি তাই আপনাকে কম টাকা দেবো না। আপনাকে আমি একদিন কষ্ট দিয়েছিলাম। আমার বাবা-মা কেউ বাসায় ছিল না সেদিনের আপনার কষ্টটার লোড নিতে পারছিলাম না। আমি আপনার সব চুড়ি কিনে নিলাম। নিশ্চয়ই কোন কষ্ট নেই আর।
-না আমার কোন কষ্ট নেই দুঃখও নেই।
আমিও যে ভুল হিসেব কষে ছিলাম সেটা বুঝে আমার লজ্জা লাগছিল।
-নিশ্চয়ই আপনি সেদিন মনে মনে আমাকে অনেক গালি দিয়েছিলেন।
না আপা না।
কাস্টমার হইল হাতের লক্ষ্মী একজন না নিলে আরেকজন তো নিবই।
আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছিলাম। সেই দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য আপনার সব চুড়ি আমি কিনে নিলাম।
আপনি আজকে বাসায় রেস্ট নিবেন। আবার এক দেড় মাস পরে যখন আসবেন এদিকে, আপনার গলার টোন শুনলেই আমি বুঝে নেবো যে আপনি এসেছেন। আমি তখনও আপনার সব চুড়ি কিনে নেব। এই চুড়িগুলো আমি আমার বান্ধবীদেরকে গিফট করবো।
এমন না আমি সবার কাছে বিক্রি করব।
উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি পড়ালেখা কতদূর করেছি। আমি বললাম
-আমি বি এ পড়ছি।
-আপনিতো ছাত্র মানুষ। আমি কিছুটা হলেও আপনার কষ্ট লাঘব করে দেব। আমার ব্যাচের সব বান্ধবীরা চুড়ি পরে। ওদের কাছে আপনার হয়ে আমি চুড়িগুলো বিক্রি করে দেবো।
উনি আমার হাতে ১৪ হাজার টাকা ধরিয়ে দিলেন এবং আমি খালি ঝাকা মাথায় নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বলতে থাকলাম,
চুড়ি লাগবো গো আপা চুড়ি?
চুড়ি লাগবো গো আপা চুড়ি?
লাল চুড়ি নীল চুড়ি সাতরঙা চুড়ি?
আজকে আর ভাই ভাবি অন্য কারোর কথা বললাম না। শুধু বলতে থাকলাম চুড়ি লাগবো গো আপা চুড়ি।
রাস্তায় একজন বলল দেখান তো দেখি। বউয়ের জন্য নিয়ে যাব। আমি খালি ঝাকাটা মাথা থেকে নামিয়ে বললাম
চুড়ি লাগবো গো আপা চুড়ি?
-আপনার ঝাঁকায় তো কোন চুড়িই নাই।
-আজকে আমার সব চুরি বিক্রি হয়ে গেছে। তাই কোন চুড়িই নাই।
-তাহলে আপনি এভাবে চুড়ি লাগবো গো আপা চুড়ি বলে বেড়াচ্ছেন কেন?
আমি একটু হেসে আবার ঝাকাটা মাথায় তুলে নিয়ে
চুড়ি লাগবো গো আপা চুড়ি
বলতে বলতে বাড়িতে চলে আসলাম।
বাসায় এসে মাকে বললাম
-মা তুমি না হাঁসের মাংস খাইতে চাইছিলা?
-হ্যাঁ চাইছিলাম তো কি হইছে?
-চুড়ি লাগবে গো আপা চুড়ি?
-আমার কেন চুড়ি লাগবে?
-মা আমার শখ হইছে আজকে তোমাকে আমি চুড়ি পরিয়ে দেব।
-এ কি! তোর ঝাকা তো ফাঁকা। চুড়ি গুলো কোথায় গেলো? সব চুড়ি তো বিক্রি হওয়ার কথা না। তুই কি ফেলে দিয়েছিস কোথাও?
-তোমার জন্য এখন আমি হাঁস কিনে আনব।
-গল্পটা কি হয়েছে বলবি তো?
-গল্পটা আমি রাত্রে বলবো আমার গায়ে এখন শক্তি নাই। খালি ঝাঁকার যে কত ওজন সেটা আমি আগে বুঝিনি। ঝাঁকা ভর্তি চুড়ি মাথায় নিয়ে হাঁটা অনেক সহজ কিন্তু খালি ঝাকা মাথায় নিয়ে হাঁটা অনেক কঠিন । সে গল্পটা মা তোমাকে রাত্রে বলবো তখনি তুমি বুঝবে।
মার হাতে টাকাগুলো দিলাম
মা । এ কি?
সব টাকার মধ্যে একটা মোবাইল নাম্বার লেখা।
টাকাগুলি হাতে নিয়ে দেখি সব টাকায় একটাই মোবাইল নাম্বার লেখা।
রহস্য বুঝতে পারতেছিলাম না।
একমাস পর যেদিন ওই পথে আবার চুড়ি মাথায় নিয়ে প্রখর রোদে হাঁটছিলাম একটা কণ্ঠ শুনে থমকে দাঁড়ালাম।
চুড়ি লাগবো গো আপা চুড়ি?
লাল চুড়ি নীল চুড়ি হরেক রকম চুড়ি?
নারী কন্ঠে আবার এই হাঁক শুনে অই বাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। নিজের অজান্তেই একবার আমি হেঁকে যাচ্ছি, আবার নারী কন্ঠ। হঠাৎ সন্বিত ফিরে ভাবলাম,কি ছেলেমানুষী করছি? মহল্লার মানুষ দেখলে কি ভাববে?
সামনে পা বাড়ালাম তারপর একসময় গলির পথটার মতো আমাদের যুগল কন্ঠের হাঁকও মিলিয়ে গেল। বিকেলটা যেন হঠাৎ করে ম্লান হয়ে টুক করে সন্ধায় হারাল। সন্ধ্যার এই আবছা অন্ধকারে আমার দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। যা কেউ দেখতে পেল না। কি জানি সেই মেয়েটার দু’চোখ বেয়েও কি জল গড়াচ্ছে এই আমারই মতো…. ?